শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৮:৩৪ পূর্বাহ্ন
ব্রেকিং নিউজ :

করোনায় পরিবেশ নাট্য ‘করো না রঙ্গ’

নাঈম রাজ / ১৫৭ বার
আপডেট সময় : রবিবার, ১৪ জুন, ২০২০

নাঈম রাজ :

পৃথিবী আজ আর আগের মতো নেই। পৃথিবীর রূপ পরিবর্তিত হয়েছে, রীতি পরিবর্তন হচ্ছে; পরিবর্তন হয়েছে মানুষের জীবনযাত্রার দৈনন্দিন অভ্যাস। মহামারি করোনা ভাইরাস যেন পৃথিবীকে গ্রাস করে ফেলছে। থমকে গেছে সবকিছু, মুখ থুবড়ে পড়ে গেছে পৃথিবীর অধিকাংশ দেশের অর্থনীতি। চারদিকে এখন শুধুই মৃত্যুর মিছিল। সে মিছিলে বাংলাদেশও যোগ দিয়েছে। আস্তে আস্তে মিছিলের ব্যাপ্তি দীর্ঘতর হচ্ছে। তবে করোনা ভাইরাস প্রাদুর্ভাবের শুরু থেকেই বাংলাদেশে বহু নাটকীয় ঘটনা ঘটে যাচ্ছে। সেগুলো নিয়ে না হয় প্রসঙ্গ ক্রমে আলোচনা করবো।

বলা যাক, বাংলাদেশের নাট্য অঙ্গনের কথা- করোনা’র শুরু থেকেই সবকিছুর মতো নাটকের কর্মশালা, মহড়া, প্রদর্শনী বন্ধ। নাট্যঅঙ্গনে এক অন্ধকারময় অধ্যায় অতিবাহিত করছি আমরা। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, ক্রমে ক্রমে বাজার, দোকানপাট, অফিস-আদালত এমন কি গার্মেন্টস সহ সকল প্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া হচ্ছে। তবে এই নাট্যজগতের প্রতি কারোই কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। কেন নেই? নাটক বা শিল্প সংস্কৃতি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কোন কাজে আসে না এ জন্য? নাকি নাটক কে আমরা পেশাদারি জায়গায় নিয়ে যেতে পারিনি এ জন্য? আসলে গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যায় মঞ্চ নাটককে বাংলাদেশের পারিপার্শ্বিকতা ঐ পেশাদারি জায়গায় নিয়ে যেতে দেয়নি।
আচ্ছা একবার ভাবুন তো, শুধু কি পেটের ক্ষুধা নিবারণ করলেই হবে? মনস্তাত্ত্বিক ক্ষুধা নিবারণ করতে হবে না? আর এই মনস্তাত্ত্বিক ক্ষুধা নিবারণ করবে কে? অবশ্যই শিল্প মাধ্যম। মানুষ শারীরিক রোগে যতটা না ক্ষতিগ্রস্ত হয় তারচেয়ে অধিক ক্ষতিগ্রস্ত হয় মনের রোগে! একজন নাট্যশিক্ষার্থী বা নাট্যকর্মী হিসেবে আমার মনে হয় অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতো নাটকের হল গুলোও খুলে দেওয়া উচিত। আমরা সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে এবং সচেতন থেকেই নাটকের মহড়া করব, প্রদর্শনী করব। আচ্ছা একটা প্রশ্ন করি- বাংলাদেশে কি “লকডাউন” নামে ঐ ঔপনিবেশিক আইন মানা হচ্ছে? মানুষ কি আদৌ বাড়ির ভিতরে থাকছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে জানালা দিয়ে একটু বাহিরে তাকিয়ে দেখুন; দেখবেন রাস্তাঘাট গুলোর অবস্থা, বাজারের অবস্থা! সেখানে মানুষ গিজগিজ করছে, তারা মুখোশটাও(মাস্ক) পড়ছে না, সচেতনতার কথা তো পরে। এমন যদি হয় আমাদের বর্তমান অবস্থা তবে কেন নাটকের মঞ্চ গুলো খুলে দেওয়া হবে না? সমাজের আর দশ-পাঁচটা মানুষ থেকে আমাদের নাট্যমনা মানুষগুলো অনেক সচেতন। যে হলের আসন সংখ্যা ৩০০ সেখানে আমরা ৫০ জন দর্শক নিয়ে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে নাটকের প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করতে পারি। অভিনেতা, পরিচালক, দর্শক সহ সবাই আত্মসুরক্ষা মূলক সবকিছু ব্যবহার করেই মঞ্চে যাব নাটক দেখতে। পূর্ব ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সকল প্রকার দূর্যোগ মহামারির সময় সবার আগে নাটকের মানুষজন এগিয়ে এসেছে। কলেরা, বসন্ত, উদারাম এ সকল রোগের সময় নাট্যকর্মী’রা হাটে-মাঠে গিয়ে নাটক মঞ্চস্থ করেছে, মানুষকে সচেতন করার জন্য। এখনো আমরা পূর্বপুরুষদের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারি। আমাদের যে ঐতিহ্যবাহী দেশজ আঙ্গিকগুলো আছে; এই যেমন- গম্ভীরা, কবিগান, জারিগান, সারিগান ইত্যাদি এগুলোর আদল খুবই নিরাপদ । আমরা সচেতনভাবে এই আদলগুলোকে ব্যবহার করে নাটকের প্রদর্শনী করতে পারি। করোনা সচেতনামূলক নাটক নিয়ে এই আঙ্গিকগুলো সুন্দর ভাবে উপস্থাপন করতে পারি। এই আঙ্গিকগুলোতে একটু-আধটু রদবদল করাও যেতে পারে। এই যেমন, গম্ভীরা থেকে শুধু দ্বৈত অভিনেতা নানা-নাতীকে নিতে পারি আর বাদ্যযন্ত্রী দলকে বাদ দিয়ে অঙ্গাভিনয়ের মাধ্যমে নাটক মঞ্চস্থ করতে পারি। তাছাড়া এগুলো মঞ্চস্থ করতে বেশি কাছাকাছি আসতে হয় না। নিরাপদ দূরত্ব মেনেই অভিনয় করা যায়।

করোনা শুরু হওয়ার কিছুদিন পর থেকেই এমনই চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিলো। বারবার মনে হচ্ছিলো, নাটকের এই অন্ধকারময় সময়ে কি করা যায়? নাটক তো আমাদের জীবন, আমাদের স্পন্দন! নাটক ছাড়া তো আমরা বাঁচতে পারবো না। যারা নাটকের সাথে যুক্ত শুধুমাত্র তাঁরাই জানেন নাটক ছাড়া থাকতে কতটা কষ্ট হয়! এমন সব ভাবনা থেকে সিদ্ধান্ত নিলাম নাহ্ কিছু করতেই হবে! শুরু করলাম করোনা সচেতনতা মূলক বিষয়বস্তু নিয়ে নাটকের পাণ্ডুলিপি লিখা। লিখা শেষ হলে আবার চিন্তায় পড়লাম এটাকে নাট্যরূপ দিবো কি করে? কয়েকজন নাট্যজনের পরামর্শ নিলাম উনারা সাধুবাদ জানালেন। মনে দৃঢ় শক্তির সঞ্চার হলো। এখন অভিনেতা খুঁজতে গিয়ে পড়লাম ঘোরতর বিপদে। অভিনেতা পাবো কোথায়? অনেক খোঁজার পর একজন বন্ধুকে পেলাম। তাঁকে পরিকল্পনা বললাম, কয়েকদিন মহড়াও করলাম। নাট্যপ্রদর্শনী সন্নিকটে- হাতে আর ৩ দিন বাঁকি; এমন পরিস্থিতিতে আমার সম্মানিত বন্ধু বললেন উনি অভিনয় করতে পারবেন না! নাটক ইসলাম বিরোধী কাজ, সমাজের মানুষ বাজে ভাবে দেখবে, আরো অনেক কিছু। আমার মন খারাপ হয়ে গেলো। তবে মনোবল ভাঙ্গেনী। আবার নতুন করে শুরু করতে হবে এই প্রত্যয় নিয়ে খুঁজতে থাকলাম আমার জয়পুরহাট জেলার মধ্যে কোন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া নাট্যশিক্ষার্থী আছে কিনা? পেয়েও গেলাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের ৩য় বর্ষের শিক্ষার্থী শাহরিয়ার মোরশেদ(সাকিব) কে। শুরু করে দিলাম মহড়া। দুজনে কয়েকদিন অক্লান্ত পরিশ্রম করার পর আমাদের নাটক এখন মঞ্চস্থের জন্য প্রস্তুত। আগামীকাল সকাল ১০.৩০ ঘটিকায় জয়পুরহাট সদরের বেলআমলা গ্রামে প্রদর্শিত হবে করোনা সচেতনতায় গীতরঙ্গ পরিবেশনা “করো না রঙ্গ”।

এই নাটকে আমি গম্ভীরার আদলটা নিয়েছি। এখানে গানের অংশ কমিয়ে দিয়েছি। কারণ, গানের জন্য বাদ্যযন্ত্রের প্রয়োজন আর বাদ্যযন্ত্রের জন্য প্রয়োজন বাদ্যযন্ত্রী। নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে শুধু মাত্র নানা – নাতীর আঙ্গিক অভিনয়ের মাধ্যমে মানুষকে সচেতন করার ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা করতে যাচ্ছি। সকলেই দোয়া করবেন।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর
Theme Created By ThemesDealer.Com