রবিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২১, ০৯:৪৮ অপরাহ্ন
ব্রেকিং নিউজ :

বাঙালির লালমিয়া এস এম সুলতান : বদরুল হায়দার

বদরুল হায়দার / ২৬৫ বার
আপডেট সময় : শনিবার, ১৭ জুলাই, ২০২১
এস এম সুলতান

সুলতান একটি সত্যের ধারক। যে সত্য হল এক অভিনব উন্মাদনার ফসল। যা অন্তর্নিহিত সত্যরূপকে ধরে রাখে রূপ ও রেখায়। সত্য সন্ধানী একজন শিল্পী হিসেবে তার প্রতিটি ভাষা ও অভিব্যক্তিতে একমাত্র সত্য সুন্দরের অবয়বই ফুটে আছে। তার সত্য হল জীবন সংগ্রামী আবহমান বাঙালি কৃষকের নিত্যদিনের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, বীরত্ব ও প্রাচুর্যের সত্য। যেহেতু শিল্পীই একমাত্র ধারণ করতে পারে শিল্পকে।

সুলতানও একজন শিল্পী। তার তুলিতে ফুটে উঠেছে সংগ্রামে সংঘর্ষে প্রতিরোধে ব্যবহৃত বাঙালি কৃষকের পেশির সর্বোত্তম ব্যবহারের মুহূর্তে অন্তঃশক্তির প্রতিরূপ।

১৯২৩ সালের আগস্টের দশ তারিখে নড়াইলের মাছিমদিয়ার এক মাটির শিশু এস এম সুলতানের (শেখ মুহাম্মদ) জন্ম। রাজমিস্ত্রির একমাত্র পুত্র সুলতানের ডাক নাম ছিল লাল মিয়া।

মামুন হোসাইন এর আঁকা ‘এস এম সুলতান’

মাটি ও মানুষ অভিন্ন। আদিমতার ইতিহাস, চেতনা, পৃথিবীর বুকে মানুষের পদভ্রমণ। যূথবদ্ধ সমাজের স্মৃতি ও আকাঙ্ক্ষা কিংবা পৌরাণিক অভিধার রহস্য উদঘাটনই ছিল সুলতানের চিত্রকল্পের বিষয়। যে কারণে তার চিত্রকর্মে দেখা যায় ভিন্নতর ব্যঞ্জনার সমাহার। প্রকৃত অর্থে_ সুলতান একবিংশ শতাব্দীর বড় মাপের মানুষের মধ্যে অন্যতম মানুষ শিল্পী। জীবনের প্রতি মমত্ববোধ, আনন্দ-উচ্ছ্বাসের বাইরে স্বতশ্চল জীবাচার, এমনকি প্রাতিষ্ঠানিক রূপরেখার বিরুদ্ধে সুলতানের চ্যালেঞ্জ আমাদের শুধু উৎসাহী করে না, প্রতিবাদী হতেও প্ররোচিত করে।

সুলতান একজন শিল্পীই ছিলেন না। একাধারে মানুষ ও শিল্পী। তাই মানুষই ছিল চিত্রকল্পের মূল আরধ্য বিষয়। তিনি মানুষের মহত্ত্ব নির্দিষ্ট করে বলতে গিয়ে বাঙালি কৃষকের অন্তরাত্মার শক্তিকে সন্তের মতো ভূমিলগ্ন ব্যঞ্জনায় আয়ত্ত করেছেন। যে কারণে যখন ভূমি মানুষের ছবি অাঁকেন তখন তিনি শুধু একজন কৃষকের ছবিই অাঁকেন না_ তিনি একজন কৃষকের প্রতিচ্ছবিকে ক্যানভাসে মূর্ত করে তোলেন। তাই ‘আদি আবাদ’ বা প্রথম বৃক্ষরোপণ চিত্রে আদি পিতা আদমের প্রতিকৃতি হিসেবে একজন বাঙালি কৃষককে দেখেছেন। শিল্পীর জীবন চর্চা ও শিল্প চর্চা বৈপরীত্যে অবস্থান করে। সেদিক থেকে সুলতান ব্যতিক্রমী এবং একক। নিজস্ব ভুবন বিচরণের অন্যতম প্রাজ্ঞপুরুষ হিসেবে সুলতানের প্রতিটি তুলির অন্ধিত কাব্য ক্যানভাসের সম্পূর্ণ জমিতে আবাদের জনক হয়ে জড়িয়ে থাকে বোধের বিশ্লেষণে। কারণ তার প্রতিটি চিত্রকর্মই ছিল বাংলার প্রাণ।

সুলতান ও বাংলাদেশের সমাজ সংস্কৃতির মধ্যে কখনো দ্বান্দ্বিক উচ্চারণ বেজে ওঠেনি। মিলন ঝংকারে অভিন্নভাবে জড়িয়ে আছে তার রক্তে বাঙালি পেশির অভ্যন্তরীণ রক্ত প্রবাহ। সুলতান সত্যের ধারকই নন; তিনি একজন সত্যিকারের বাঙালি।

দুই.

বেদনা যেখানে স্থিরচিত্র সেখানে দূরগামী পদযাত্রী হয়ে আনন্দে ভেসে ওঠে। ঐতিহ্যে একক অভিধান যেখানে শেষ হয়। শিল্পী সেই স্থিরতা থেকে আরম্ভ করে। শিল্পী সুলতানের শুরু ও শেষ এ দুটি শব্দকে আলাদা করে দেখলে তিনি সর্বকালের ঐতিহ্য ইতিহাসের একক ধারক-বাহক। যে কারণে তার ‘চরদখল’ চিত্রে বাংলার ঐতিহ্য ইতিহাসকে ধারণ করে আছে পেশিশক্তির ব্যবহার। বাংলার চিত্র ঐতিহ্যের প্রেক্ষাপটে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নন্দলাল বসু, যামিনী রায়, জয়নুল আবেদিন প্রমুখ প্রধান চিত্রশিল্পীর নাম উচ্চারণ করলেই সুলতান তাদের মধ্যে বিশাল এক পৃথিবী। যেখানে মানুষ পেশিশক্তির অভ্যন্তরীণ ক্ষুধাকে একমাত্র পেশিহীন বা পেশিবহুল অনুভূতিকে এক সমগ্র সত্তার অবস্থানে নিয়ে যায়। যে অনুভূতি সুলতানকে নিয়ে যায় বাংলার চিত্র ঐতিহ্যে। দূরগামী দৃষ্টির এই প্রজ্ঞাপুরুষ, ভবিষ্যৎদ্রষ্টা সুলতান বড় মাপের মানুষদের মধ্যে অন্যতম।

নন্দলাল বসুই প্রথম ব্যক্তি যাকে সার্থক বাঙালি শিল্পীর আসনে দাঁড় করানো যায়। কিন্তু সে এক বা একককে ভেঙে প্রতিটি শিল্পী নিজস্বতা দিয়ে বেরিয়ে আসে। সে ক্ষেত্রে অবনীন্দ্রনাথের কুয়াশাচ্ছন্ন স্বপ্নাহত নিমগ্নে নন্দলালের রেখা প্রধান চিত্রসমূহ বস্তুনিষ্ঠতা লাভ করে বাস্তব জগতে। নন্দলাল বাংলা চিত্রশিল্পীকে লোকায়ত ও ধ্রুপদ প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যরীতির মিছিলে নানা ভাঙচুরের মাধ্যমে একটি ফ্রেমের ওপর দাঁড় করাতে চেয়েছেন। কিন্তু সে অর্থে যামিনী রায় দেশীয় ঐতিহ্যের মনোমুগ্ধকর এবং বাংলার একান্ত ঘরোয়া শিল্পী তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সুলতান ও তার দিঘল উচ্ছ্বাসে বাংলার মানুষের সরল অস্তিত্ব তথা জনজীবনের ব্যাপকতাকে লোকজ সত্তায় পেশির মধ্যে দেখাতে চেয়েছেন। পেশিশক্তির অভ্যন্তরে জমে থাকা যন্ত্রণা, হাসি-আনন্দের সম্মিলনই তার চিত্রশিল্পের প্রাণ। জয়নুলের ‘কাক’ ছবি যেভাবে শিল্পে সম্ভাবনার সম্ভাবনা হয়ে দেখা দিল, আর সামাজিক চিত্রাবলির মধ্যেই একদিন জয়নুল প্রকৃত স্থায়ী আসন করে নিয়েছেন।

তেমনি সুলতানের ‘আদি আবাদ’ও সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র সম্ভাবনা নিয়ে সমগ্র বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। সে অর্থে সুলতান শিল্পী হিসেবে তার শিল্পকর্মে সম্পূর্ণ সুলতান হয়ে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।মূলত সুলতান জীবন-যুদ্ধের কবি। সুলতানের অঙ্কিত কবিতা প্রতিটি মানুষের অন্তর ক্যানভাসে প্রশ্ন হয়ে থাকুক। সুলতান কি মানুষ না শিল্পী?

তিন.

শিল্পীর সম্পূর্ণ পরিচয় একমাত্র শিল্পে। পাশ্চাত্য শিল্পের সমালোচক আরভিং স্টোন যখন মিকেলেঞ্জেলো ও ভ্যান গগের জীবন নিয়ে উপন্যাস রচনা করেন_ তখন সুলতান প্রতিটি বাঙালির আত্ম-উপন্যাসে তার জীবন ও শিল্প নিয়ে উপন্যাস রচনায় ব্যস্ত। অন্যদিকে সমারসেট মম পল গগ্যার জীবনকাহিনী লেখেন অথবা রমারল্যা উপন্যাসের পরিসরে সংগীত শিল্পী বেটোফেনের মানস জীবনের নিরন্তর ঝঞ্ঝাকে ধারণ করতে চেষ্টা করেন, তখনই সব প্রয়াসের মধ্যে সুলতানের লাইভস অব দ্য রেনেসাস পেইন্টার্সের প্রতিটি স্পষ্ট অস্পষ্ট জলচ্ছবির মতো তার চিত্রের দূরদর্শী দর্শক সমালোচকদের মধ্যে জিজ্ঞাসা হয়ে দেখা দেয়।

ছবি অাঁকতে গেলে বা ভাস্কর্য গঠিত হওয়ার পর শিল্পীর আর কোনো স্বতন্ত্র অস্তিত্ব থাকে না। কারণ একমাত্র শিল্পী এবং তার সৃষ্ট সত্তায় তার পরিচয় ফুটে ওঠে। শিল্প ও শিল্পীর মধ্যে দ্বান্দ্বিক জৈবিক ও সম্পর্ক সূচক অস্তিত্বকে উদঘাটন সম্ভব হয়নি। এমনকি শিল্প থেকে শিল্পীকে আলাদা করে দেখার সনাতন চোখটিও দর্শক সমালোচকরা এখনো তাদের অন্তরাত্মায় পেঁৗছাতে পারেনি। শিল্প সৌকর্যের এই পুষ্টিহীন তৃতীয় সত্তায় সুলতান অন্য চোখে ঐতিহাসিক বাঙালির ঐতিহ্যে তার দেখাকে গৃহে নিয়ে গেছেন। যে অর্থে একজন বিজ্ঞানী তার মেধাশক্তি দিয়ে নতুন কিছু আবিষ্কার করেন এবং যে মেধার বলে সে বিজ্ঞানী। পারিপাশ্বিক যুক্তি শৃঙ্খলের বিন্যাসে একজন দার্শনিক জীবন ও জগতের নতুন অর্থ খুঁজে বের করেন। একজন কবি যেভাবে তার দূরদৃষ্টিসম্পন্ন মেধাশক্তির প্রয়োগে উপমা, চিত্রকল্প, ছন্দ, অলঙ্কার, অভিব্যক্তি সহযোগে অদৃশ্য পথ খুঁজে বের করতে চেষ্টা করেন।
সুলতানের শরীর সৌন্দর্যের প্রতি গভীর অনুরাগ ও শক্তির যুগল সম্মিলনের কৌশল রেনেসা শিল্পীদের কাছ থেকে শেখা। এই কারণে সুলতানের কৃষক আর জয়নুলের কৃষক এক নয়। জয়নুলের কৃষক জীবনধারণ করেন আর সুলতানের কৃষক জীবনের সাধনায় নিমগ্ন। তারা মাটিকে চাষ করে ফসল ফলায় না, পেশিশক্তি দিয়েই প্রকৃতির সঙ্গে সঙ্গম করে প্রকৃতিকে ফুলে ফলে সন্তানবতী হতে বাধ্য করে। যেহেতু চেতনার উড্ডিন অবস্থা থেকে শিল্পের সৃষ্টি। চেতনাকে সমাজে দৃশ্যমান করে তোলার জন্যই শিল্পী অনেক সময় আউট সাইডার হয়ে পড়েন। অর্থাৎ সমাজের কার্যকরণ সম্পর্কে সুগ্রন্থিত চেতনার স্তর থেকে অন্য একটি কল্পিত স্তরে নিজেকে টেনে তুলতে হয় বলে শিল্পী সমাজ থেকে আলাদা হয়ে পড়েন। শিল্পচেতনার গতি যদি জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পায় সেখানে শিল্পচেতনার সঙ্গে সামাজিক চেতনার একটি সংঘাত ঘটবে। সুলতানের শিল্পচেতনাও একটি চেতনা সর্বস্ব চেতনালোকে অবেচেতন বা অচেতনভাবে সম্পূর্ণ সুলতান হয়ে সংঘাত ঘটে। এ কারণে ব্যক্তি ও শিল্পীর দ্বন্দ্ব ও তৃতীয় সত্তার মানুষের পরিচয় হয়ে দেখা দেয়, যা সুলতানের জীবন ও শিল্পে দেখা যায়। মূলত সুলতান তার শিল্পে প্রতিকী ও বাস্তবের গভীর তল ছুঁয়েছেন নানাভাবে। সুলতান অনির্ধারিত বাঙালির আগমনের সাথী হয়ে বেঁচে থাকুক।

চার.

চেতনার স্পর্শ না পেলে কোনো সৃষ্টিই নির্মাণের স্তর অতিক্রম করে শিল্পকর্মের ব্যঞ্জনা লাভ করে না। শিল্প প্রেরণার এই দ্বান্দ্বিক ধরনও প্রত্যেকটি শিল্পকে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে চিহ্নিত করে। কারণ প্রেরণা অস্তিত্বকে পুড়িয়ে অন্যরূপে রূপান্তরিত করার সুন্দর সুখকর এমনকি আনন্দ বেদনাদায়ক অনুভূতি। এই অনুভূতি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রঙ ও রূপে আত্মপ্রকাশ করে। সুলতানের প্রেরণার মধ্যে মানুষের ইতিহাসই একমাত্র অবলম্বন ছিল, যা প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের প্রেরণার সম্মিলন করতে গিয়েই তার ‘মাছকাটা’ চিত্রে প্রকৃতির নারীর হাতে মাছের কাঁটাকে এক করে দেখতে চেয়েছেন। কারণ ধূসর উল্লাসের মধ্যে একজন নারী তার যৌবনদীপ্ত পেশিশক্তিকে কাজে লাগিয়েছেন। যেহেতু শিল্পীর ক্ষমতা বা যোগ্যতায় যত দূরত্বই থাকুন না কেন একই সময়ে সৃষ্ট নানা শিল্পের মধ্যে একটি সাধারণ ব্যাপ্ততা লক্ষ্য করা যায়। রেনেসাস-উত্তর রেনেসাস, ইম্প্রেশনিস্ট, ইমেজিস্ট, সুরিয়ালিস্ট শিল্পের কতকগুলো সাধারণ লক্ষণ দেখা গিয়েছিল। সেদিক থেকে সুলতানের চিত্রেও দ্য ভিঞ্চি মিকেলেঞ্জেলো, রাফায়েল প্রমুখ শিল্পীর প্রকান্ত কল্পনা ও কল্পনার বলিষ্ঠতার ছাপ গভীর ও সম্পর্কযুক্ত বলে মনে হবে যা কোনো মধ্যবর্তিতার বিশ্বাস ছাড়া অন্য কিছু নয়, শিল্পী যেখানে সর্বশেষ প্রজ্ঞাকে একমাত্র কাজে লাগিয়ে শিল্প রচনা করেন। সে ক্ষেত্রে সুলতান তার আত্ম উন্মাদনা, বাউলবোধ, মনীষায় তার সৃষ্ট প্রজ্ঞাকে কাজে লাগান। বাঙালি চেতনা প্রলুব্ধ শিল্পীর সঙ্গে ভারতীয় শিল্পীর তুলনা চলে না। অবনীন্দ্রনাথ, যামিনী রায়, নন্দলাল, জয়নুল আবেদিন, আবদার রহমান, চুগতাই নাগী, এসব দিকভ্রষ্টা শিল্পীর মধ্যে যতই পার্থক্য থাকুন না কেন তবুও সবার মধ্যেই অন্তর্নিহিত হিসেবেই সুলতান উপস্থিত।
হেগেল ভারতীয় শিল্প দর্শনের যে বিস্তৃত সংজ্ঞা দিয়েছেন কেউই সুলতানের আওতাকে ছাড়িয়ে যেতে পারেননি। শিল্পের জরায়ুর বন্ধন ছিন্ন করে একমাত্র সুলতানই অন্য বিশ্বে বাঙালি জাতির ইতিহাসকে যুক্ত করে দিলেন। কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের বীরের মতো তার পেশিবহুল মানুষের চিত্র বীরত্বকে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন। সুলতান ইতিহাসে বাঙালির প্রতিটি জাগ্রত পেশির ঐতিহ্যে একজন সার্থক শিল্পী হিসেবে বেঁচে থাকবেন।
সুলতান ও বাঙালির অন্তরাত্মায় আগামীর লাল মিয়ার জন্মই হবে আরেক সুলতানের আবির্ভাব। সুলতান একজন বাঙালি। তার কৃষকও বাঙালি।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

এ জাতীয় আরো খবর
Theme Created By ThemesDealer.Com